বর্তমান সময়ে উচ্চ কোলেস্টেরল বিশ্বজুড়ে একটি অন্যতম স্বাস্থ্য সমস্যা। হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ধমনীতে ব্লকেজের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয় এই খারাপ কোলেস্টেরল বা LDL (Low Density Lipoprotein)। তাই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে কোলেস্টেরল কমানো একটি কার্যকর এবং নিরাপদ উপায়।
এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে আখরোট (Walnut)—যা শুধু একটি সুস্বাদু বাদাম নয়, বরং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত একটি ‘হৃদ্স্বাস্থ্যকর খাবার’। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব আখরোট কীভাবে কোলেস্টেরল কমায়, প্রতিদিন কতটা খাওয়া উচিত, খাওয়ার সঠিক নিয়ম, কারা খেতে পারবেন না এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য উপকারিতা।
আখরোটে কী আছে? (পুষ্টিগুণ)
এক আউন্স (≈২৮–৩০ গ্রাম বা ৭–৮টি পুরো আখরোট) আখরোটে গড়ে থাকে:
ক্যালোরি: ≈185 kcal
ফ্যাট: ≈18 গ্রাম (এর মধ্যে অধিকাংশই আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট)
প্রোটিন: ≈4 গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট: ≈4 গ্রাম
ফাইবার: ≈2 গ্রাম
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (ALA): ≈2.5 গ্রাম
ভিটামিন ও মিনারেল: ম্যাগনেসিয়াম, কপার, ম্যানগানিজ, ভিটামিন B6
আখরোট কীভাবে কোলেস্টেরল কমায়?
১. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (ALA)
আখরোট হচ্ছে উদ্ভিজ্জ উৎসের মধ্যে অন্যতম সেরা ওমেগা-৩ (ALA)। এটি শরীরে প্রদাহ কমায় এবং হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড কোলেস্টেরল লেভেল এবং রক্তের ফ্যাট প্রোফাইল উন্নত করে।
২. আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট
আখরোটে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ খুবই কম। পরিবর্তে থাকে পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (PUFA) এবং মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (MUFA), যা LDL (খারাপ কোলেস্টেরল) কমাতে সহায়ক।
৩. পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
আখরোটের বাদামী খোসায় প্রচুর পলিফেনলস থাকে। এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, LDL কোলেস্টেরলকে অক্সিডাইজড হওয়া থেকে বাঁচায়, ফলে ধমনীর ক্ষতি কমে।
৪. প্ল্যান্ট স্টেরলস ও ফাইবার
আখরোটে থাকা ডায়েটারি ফাইবার ও প্ল্যান্ট স্টেরলস অন্ত্রে কোলেস্টেরল শোষণ কমায়। এর ফলে রক্তে মোট কোলেস্টেরল লেভেল কিছুটা হ্রাস পায়।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণ
র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল
একটি দীর্ঘমেয়াদি ট্রায়ালে দেখা গেছে, প্রতিদিন আখরোট খেলে LDL কোলেস্টেরল প্রায় ৮–১০% পর্যন্ত কমতে পারে।
আখরোট খাওয়া অংশগ্রহণকারীদের রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডও নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
সিস্টেম্যাটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালিসিস
একাধিক গবেষণার সম্মিলিত ফলাফল বলছে—প্রতিদিন প্রায় ৩০ গ্রাম আখরোট খাওয়া LDL ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে, HDL (ভালো কোলেস্টেরল) সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে আখরোটকে কার্যকর খাবার হিসেবে ধরা হয়।
প্রতিদিন কতটা আখরোট খাবেন?
স্ট্যান্ডার্ড পরিমাণ: ১ আউন্স বা ২৮–৩০ গ্রাম (≈৭–৮টি পুরো আখরোট বা ১৪টি হাফ)।
ফ্রিকোয়েন্সি: প্রতিদিন বা সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন।
ক্যালোরি হিসাব: প্রতিদিন ১৮৫ ক্যালোরি অতিরিক্ত হবে, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে অন্য উৎস থেকে ক্যালোরি কমিয়ে নিন।
আখরোট খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি
1. ভেজানো আখরোট: রাতে ভিজিয়ে সকালে খেলে হজমে সুবিধা হয়।
2. কাঁচা বা হালকা ভাজা: তেলে ডিপ-ফ্রাই নয়, শুকনো ভাজা সবচেয়ে ভালো।
3. মিশিয়ে খান: দই, ওটস, স্মুদি, সালাদ বা ডালের সঙ্গে।
4. স্ন্যাক্স হিসেবে: প্রতিদিন আলাদা ছোট প্যাকেটে ৩০ গ্রাম করে রেখে দিন—অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
আখরোটের অন্যান্য স্বাস্থ্য উপকারিতা
হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।
ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে (মেলাটোনিন থাকে)।
ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে।
হজমশক্তি ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে।
কারা সাবধান থাকবেন?
বাদামে অ্যালার্জি: থাকলে আখরোট এড়িয়ে চলা উচিত।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান: যেমন ওয়ারফারিন—ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া হঠাৎ বেশি আখরোট খাবেন না।
হজমের সমস্যা: বেশি খেলে গ্যাস/অস্বস্তি হতে পারে।
শিশু: ছোট বাচ্চাদের (৫ বছরের নিচে) পুরো আখরোট দেবেন না—গিলতে সমস্যা হতে পারে, গুঁড়ো করে দিন।
FAQ
প্রশ্ন: দিনে মাত্র ২–৩টা আখরোট খেলেই কি উপকার হবে?
উত্তর: কিছুটা উপকার পাবেন, তবে গবেষণায় সাধারণত ৩০ গ্রাম (≈৭–৮টি আখরোট) ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রশ্ন: আখরোট কি ওষুধের বিকল্প?
উত্তর: না। ডাক্তার যে ওষুধ দিয়েছেন, সেটা বন্ধ করা যাবে না। আখরোট হলো সহায়ক খাবার।
প্রশ্ন: কোন সময় খাওয়া ভালো?
উত্তর: সকালে নাশতার সঙ্গে বা বিকেলে স্ন্যাক্স হিসেবে।
আখরোট শুধুমাত্র একটি বাদাম নয়, বরং হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একটি সুপারফুড। প্রতিদিন মাত্র এক মুঠো আখরোট খেলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল কমে, ভালো কোলেস্টেরল সুরক্ষিত থাকে এবং সামগ্রিকভাবে হৃদ্স্বাস্থ্য উন্নত হয়। তবে ওজন নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসকের পরামর্শের সঙ্গে মিলিয়েই এটি খাওয়া উচিত।
আজ থেকেই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় এক মুঠো আখরোট যোগ করুন—ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনের বড় উপহার।

Leave a Reply